খেজুর গাছ : মৌসুমী গুড়ের ভান্ডার
“ঝোপের ভিতর কাঠের গাই/শীত সকালে দোহাতে পাই”
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন চিনির প্রয়োজন হয় এবং আখের স্বল্প অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের কারণে আমদানিকৃত চিনি মোট চাহিদার প্রায় ৯৯ শতাংশ পূরণ করে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার সুপারিশকৃত নূন্যতম ১৩ কেজি হিসাবে 18 কোটি লোকের জন্য গুড় ও চিনি মিলিয়ে প্রয়োজন প্রায় 24 লক্ষ টন। এ প্রেক্ষাপটে চিনি ও গুড়ের উদপাদন বৃদ্ধির জন্য আখের উৎপাদন বৃদ্ধির বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি অন্যান্য চিনি উৎপাদনকারী ফসল যেমন খেজুর ও তাল গাছ রোপন ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন অপরিহার্য। কেননা, এ সব উদ্ভিদ দীর্ঘ সময় গুড় বা চিনির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ না হওয়ায় দেশে খেজুর গাছ তথা গুড় উৎপাদন সংক্রান্ত প্রকৃত তথ্যের অভাব রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে যশোর জেলায় সর্বোচ্চ ৫,০০০ একর জমিতে খেজুর চাষ হয়। এছাড়া বরিশাল, খুলনা, ফরিদপুর, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও রাজশাহী জেলায় বেশ কিছু খেজুর গাছ রয়েছে। আগে সারাদেশে প্রায় ৩০ হাজার একরে উৎপাদিত গাছ হতে খেজুরের গুড় উৎপাদন হতো। প্রতিকূল পরিবেশে খেজুর গাছের খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা বাস্তবে আছে বলেই, অযত্নে অবহেলায়ও কোন গাছ এত সতেজতা সৌন্দর্যে ও সৌষ্ঠবে বিকশিত হতে পারে প্রকৃতিতে তার অনন্য উদাহরণ খেজুর গাছ।
লবণাক্ত এবং কংকর হতে এঁটেল পর্যন্ত প্রায় সব রকম মাটিতেই খেজুর গাছ জন্মে। হিমাষ্কের কাছাকাছি হতে ৫০০ সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে পারলেও শষ্ক আবহাওয়ায় খেজুর গাছ ভাল জন্মে। পলিথিন ব্যাগে চারা উৎপাদন করে বর্ষার প্রারম্ভে গর্ত করে ছাই, গোবর বা কম্পোস্ট সার দিয়ে মূল শিকড়সহ চারা ৪ মিটার দূরত্বে রোপণ করতে হয়। চারার মাঝে মাঝে সেচ ও জৈব সার দিলে অল্প সময়ে উৎপাদনক্ষম হয়। উৎপাদনক্ষম গাছে প্রতিবছর ৮০ কেজি গোবর বা আবর্জনা পঁচা সার, ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১ কেজি টিএসপি, ৫০০ গ্রাম এমপি সার বর্ষার শুরুতে এবং শেষে দু’বার ব্যবহার করলে অধিক পরিমাণে রস পাওয়া যায়। তাছাড়া শীতকালে রস সংগ্রহ করা হয় ফলে দু’তিন বার সেচ দিলে ফলন বাড়ে, কেননা ঐ সময় মাটিতে রসের পরিমাণ খুবই কম থাকে। ৬-৭ বছর থেকে শুরু করে প্রায় ৬০ বছর বা তারচেয়ে বেশি সময় ধরে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা যায়, তবে অনুর্বর জমিতে অযতেœ বেড়ে ওঠা গাছ দেরিতে উৎপাদনক্ষম হবার পূর্ব পর্যন্ত খেজুর গাছের বাগানে সাথী ফসল হিসাবে শীতকালীন সবজি, ডাল, গম, তুলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি সাফল্যজনকভাবে চাষ করা সম্ভব। রস সংগ্রহের উপরোগী স্ত্রী জাতের গাছে শীতের শেষে মোচাকৃতি সুগন্ধি ফুলের ছড়া বের হয়, তাতে যে ফল হয় তা জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় মাসে পাকে, তবে ফল ছোট আকারের আঁশের পরিমাণ বেশি এবং সুস্বাদু ও মিষ্টি নয়, তাছাড়া বীজ ও তুলনামূলকভাবে আকারে বড়। তবুও খেজুর শিশু ও পাখিদের প্রিয় এবং পাখির মাধ্যমে ছড়ানো বীজ হতে জন্মানো চারাই এ উপকারী গাছটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করছে।
শীতের প্রারম্ভে গাছের বর্ধিঞ্চু অংশ ত্রিভজ আকৃতিতে কেটে সেখানে বাঁশের নল লাগিয়ে হাড়িতে রস সংগ্রহ করা হয়। রস সংগ্রহের পরপরই জ্বাল দিতে হয় এবং সংগ্রহের জন্য মাটির হাঁড়ি ব্যবহৃত হলে অল্পতাপে বা সারাদিন রোদ্রে শুকিয়ে নিতে হয় নচেৎ সংগৃহীত রস ফারমেন্টেশন হয়ে এলকোহলে পরিণত হয়। এতে গুড়ের পরিমাণ এবং মান উভয়ই খারাপ হয়। রস জাল দিয়ে সিরাপের মত ঘন করে মাটি বা ধাতব পাত্রে ঢেলে রাখলে কয়েদিনের মধ্যে দানা বাঁধে, একে ঝোলা গুড় বলে। বেশি ঘন রস বøক আকারে ট্রেতে ঢেলে রেখে পাটালি গুড়ে পরিণত করা হয়। গুড় সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত মাটির পাত্রের গায়ে আলকাতরা বা কাল রঙ দিলে গুড় দীর্ঘদিন সংরক্ষিত রাখা যায়। নভেম্বর হতে এপ্রিল পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা হয়। মেঘমুক্ত আবহাওয়ায়, বেশি শীতে রসের মান ও পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। পুরুষ গাছের রসের পরিমাণ ও মিষ্টতা কিছুটা বেশি। সাধারণত তিন রাত্রি রস সংগ্রহের পর দুই/ তিন দিন বিরতি দেয়া হয়। সংগৃহীত রস জ্বাল দিয়ে শীত মৌসুমে প্রতিগাছ হতে ২৫-৩০ কেজি তথা প্রতিহেক্টরে ১০-২০ টন গুড় উৎপন্ন জরা হয়। আখের রসের ময়লা পরিষ্কার ও গুড় স্বচ্ছ করার জন্য ক্ষতিকারক হাইড্রোজ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু খেজুর গাছ নিঃসৃত রস স্বচ্ছ থাকায় এতে কোন রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না, তাই এটা স্বাস্থ্যসম্মত ও উপকারী।
খেজুরের গুড় সুস্বাদু ও সুদন্ধযুক্ত এবং কিচুটা আঠালো হওয়ায় মুড়ি, চিড়া ও খৈ-এর মোয়া তৈরির জন্য খুবই উপযোগী। এছাড়া শীতের সকালে মুড়ি আর পাটালি গুড় হতে শুরু করে খেজুরের গুড়ের তৈরি বিভিন্ন প্রকার মিষ্টান্ন যেমন- পায়েল, রস পিঠা, সন্দেশ, প্যারা জাতীয় মিষ্টি বাংলার ঐতিহ্য, সামাজিকতা এবং আনুষ্ঠানিকতায় মিশে আছে যুগ যুগ ধরে। খেজুরের গুড় পুষ্টিমানে আখের গুড়ের চেয়ে উন্নত, কেননা এতে অধিক প্রোটিন, ফ্যাট, খনিজ লবণ ও ভিটামিন বিদ্যমান। প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থেও ‘খর্জুর’ ( খেজুর) ফলটি শ্রমঘটিত ক্ষয়পূরণে সক্ষম এবং এই বৃক্ষের মস্তকের রস প্রতিদিনের ক্ষং দূর করে বলে উল্লেখ আছে। খেজুরের কাঁচা ফল হেমনের ক্লান্তি ও ক্ষয় রোধে মূল্যবান ভেষজ, পাকা ফল বহু রোগের ওষুধ ও পথ্যরূপে ব্যবহৃত হয়। পাতার রস আমাশয়, টাটকা রস মুত্রাশয়ের রোগ, দঁাঁতের রোগের ঔষূধে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া খেজুর পিত্তনাশক, অগ্নিবর্ধক ও কোষ্ঠকাঠিন্য বিদূরক হিসাবে সমাদৃত। গাছের পাতা পাটি ও আঁশ রশি তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়।
সারাদেশে ৩৬ লক্ষ হেক্টর জমি আখ চাষের উপযুক্ত হওয়া সত্তেও অন্যান্য স্বল্পকালীন ফসলের চাপ, মাথাপিছু জমির স্বল্পতা ও শহরায়নের কারণে চর অঞ্চল ছাড়া আখ চাষের এলাকাবৃদ্ধির সুযোগ নেই। চক্ষান্তরে, দেশের ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন কাঁচা রাস্তা, গ্রাম অঞ্চলের আধাপাকা ও পাকা রাস্তা, আঞ্চলিক সড়ক, রেল সড়ক মিলিয়ে প্রায় ১৮,০০০ কিঃ মিঃ এর অধিক রাস্তা রয়েছে। এ সমস্ত রাস্তার ধারে আংশিক এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাষযোগ্য পতিত জমিতে, পুকুর পাড়ে তথা চাষের জমির আইলে সুদৃশ্য, সুউচ্চ ও সরল প্রকৃতির এ উপকারী গাছটির রোপন ও যতেœর মাধ্যমে অধিক পরিমাণ গুড় উৎপাদন করে চিনির ঘাটতির আংশিক হলেও মিটানো সম্ভব। প্রতিটি গাছ থেকে জীবনকালে ৩০-৫০ হাজার টাকা মূল্যের গুড় উৎপাদিত হয় যার ওজন এক টনের অধিক। প্রতিটি বসতবাড়ির আঙ্গিনায় ২টি করে খেজুর গাছ রোপণ করে পারিবারিক গুড়ের চাহিদা মিটানো এবং পুষ্টির যোগান দেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া উপক‚লীয় এলাকায় বাঁধের উপর পালাক্রমে সারিতে ৩-৪ সারি খেজুর গাছ ৩ মিটার দূরত্বে রোপণ করে জলোচ্ছ¡াস ও ঝড় অত্যন্ত ফলপ্রসূভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য চাষাবাদযোগ্য মূল্যবান জমি ব্যবহারের কোন প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন চাষ ও সংশ্লিষ্ট সকলের সচেতনতা, সদিচ্ছা এবং পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগ।
সারাদেশে ৩৬ লক্ষ হেক্টর জমি আখ চাষের উপযুক্ত হওয়া সত্তেও অন্যান্য স্বল্পকালীন ফসলের চাপ, মাথাপিছু জমির স্বল্পতা ও শহরায়নের কারণে চর অঞ্চল ছাড়া আখ চাষের এলাকাবৃদ্ধির সুযোগ নেই। চক্ষান্তরে, দেশের ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন কাঁচা রাস্তা, গ্রাম অঞ্চলের আধাপাকা ও পাকা রাস্তা, আঞ্চলিক সড়ক, রেল সড়ক মিলিয়ে প্রায় ১৮,০০০ কিঃ মিঃ এর অধিক রাস্তা রয়েছে। এ সমস্ত রাস্তার ধারে আংশিক এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাষযোগ্য পতিত জমিতে, পুকুর পাড়ে তথা চাষের জমির আইলে সুদৃশ্য, সুউচ্চ ও সরল প্রকৃতির এ উপকারী গাছটির রোপন ও যতেœর মাধ্যমে অধিক পরিমাণ গুড় উৎপাদন করে চিনির ঘাটতির আংশিক হলেও মিটানো সম্ভব। প্রতিটি গাছ থেকে জীবনকালে ৩০-৫০ হাজার টাকা মূল্যের গুড় উৎপাদিত হয় যার ওজন এক টনের অধিক। প্রতিটি বসতবাড়ির আঙ্গিনায় ২টি করে খেজুর গাছ রোপণ করে পারিবারিক গুড়ের চাহিদা মিটানো এবং পুষ্টির যোগান দেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া উপক‚লীয় এলাকায় বাঁধের উপর পালাক্রমে সারিতে ৩-৪ সারি খেজুর গাছ ৩ মিটার দূরত্বে রোপণ করে জলোচ্ছ¡াস ও ঝড় অত্যন্ত ফলপ্রসূভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য চাষাবাদযোগ্য মূল্যবান জমি ব্যবহারের কোন প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন চাষ ও সংশ্লিষ্ট সকলের সচেতনতা, সদিচ্ছা এবং পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগ।