পারিবারিক বাগানে অপ্রচলিত সারের ব্যবহার
বন থেকে ফল সংগ্রহ করে ক্ষুন্নিবৃত্তি প্রচেষ্টায় এক পর্যায়ে মানুষ অবাক বিষ্ময়ে দেখল ছড়িয়ে পড়া বীজ থেকে যে নতুন গাছের জন্ম তাতেও একই ধরনের ফল ধরেছে। প্রকৃতির কাছে এই প্রথম দীক্ষা নেয়েই শুরু করল নিজ হাতে বীজ বপন করে গাছ-পালা জন্মানো, আর তাতে অগ্রণী ভূমিকা ছিল নারীকুলের। গাছের ডাল দিয়ে মাটি খুড়ে প্রথম বীজ লাগিয়েছিলেন কোন মহিয়সী আজ তা অজ্ঞাত। মানুষের পেশা কৃষির সূচনা থেকে লাঙ্গল দিয়ে মাটির বুক চিরে খাদ্য উৎপাদনের যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তা আজও যেমন অটুট আছে, শ্বাশত সেই সংগ্রাম হয়ত মানুষ যেদিন মঙ্গলগ্রহে বসতি স্থাপন করবে সেদিনও নূন্যতম বিবর্তিত অবস্থায় চলতেই থাকবে।
নিজ হতে গাছ রোপণের পর তার যত্ন বা বৃদ্ধির ব্যানারে যে ধারনাটি প্রথম মানুষকে উচ্চ করে তা হচ্ছে সারের ব্যবহার। খৃষ্টপূর্ব ২০০০ সনেও সারের ব্যবহারের প্রমাণ মানুষ কালের সাক্ষী হিসেবে ধরে রেখেছে। শুরুতে কৃষির সকল বলয় সমভাবে বর্ধিত হয়নি। বড় বড় কারখানার উৎপাদিত সারের ব্যবহারের ব্যাপকতা খুব বেশি দিনের কথা নয়। সফলভাবে শস্য উৎপাদনের জন্য মাটিতে কমপক্ষে ৫ (পাঁচ) ভাগ জৈব পদার্থ থাকা আবশ্যক হলেও (মরিশাসে ১২%) বাংলাদেশের মাটিতে এর পরিমাণ ক্ষেত্রবিশেষ এক ভাগেরও নিচে। এই বিপদজনক পরিস্থিতির কথা ভেবে এদেশের প্রতিতযশা মৃত্তিকা বিজ্ঞানীগণ পলি গঠিত এই ব-দ্বীপ ভ‚মির মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ সংরক্ষণ, বর্ধন, উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য যেসব জৈব সারের ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তার মধ্যে রয়েছে-পচা গোবর, গো-চনা, পচা পাতা, খামার বর্জ্য কমপোষ্ট বা আবর্জনা পচা সার, খামার বাড়ি সার, রান্নাঘরের বর্জ্য, ছাই, কচুরিপানা, বোঁদমাটি, নর্দমা সার, মিউনিসিপ্যালিটি কম্পোস্ট (মনুষ্য মল বা নরবর), - (পাখির জমাট মল), ফিস মিল, হাড়ের গুঁড়া, ব্যাসিক ¯øাগ, চুন, খৈল (সরিষা), তিল, তিসি, নারিকেল, (রেড়ি) ও বিভিন্ন প্রকার সবুজ সার ( দেশি, আফ্রিকান ধৈঞ্চ, পাট, শনপাট, নীল, গোশিম, কলাই জাতীয় ফসল ও বায়োগ্যাস প্লান্টের ব্যবহৃত দ্রব্যের পচনক্রিয়া শেষে প্রাপ্ত জৈব সার। জৈব সার মাটিতে জৈব পদার্থ বৃদ্ধির মাধ্যমে মাটির পানি ও বায়ু ধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে মাটির গঠন প্রকৃতিতে উৎকর্ষ সাধন করে, অনুজীব ও কেঁচোর সংখ্যা ও কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে মাটি উর্বর ও উৎপাদানক্ষম করে তোলে এবং রাসায়নিক সারের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়, যা দীর্ঘদিন বজায় থাকে, পক্ষান্তরে শুধুমাত্র রাসায়নিক সারের অবিরাম ব্যবহারে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয়। তাই মাঠ ফসলের জমিতেও রাসায়নিক সারের সঙ্গে অবশ্য কোন জৈব সার ব্যবহার করতেই হবে। স্বল্প পরিসরের পারিবারিক বাগানে বা টবে লাগানো বিভিন্ন গাছের বেলায় জৈব সারের ব্যবহার স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশ অনুক‚ল। এসব গাছ সংরক্ষণে ও জৈব রাসায়নিক তথা প্রকৃতি থেকে প্রাপ্তদ্রব্য যেমন- নিমের খৈল (সার হিসাবে) নিমের তেল, তামাক পাতা ও কান্ডের ভিজানো রস, ছাই, কেরোসিন মিশ্রিত ছাই, মরিচের দ্রবণ, পিয়াজের রস, রসুনের রস, সাবানের পরিত্যক্ত ফেনা প্রর্ভতি ব্যবহার করা ভালো। টবে গাছ লাগানোর পূর্বে গাছের আকৃতির সঙ্গে টবের আকারের সামঞ্জস্য, টবের পরিমাণ ও পদ্ধতিমত খোয়া, বালি ও জৈব সার মিশ্রিত মাটি স্তরে স্তরে সাজানো, গাছ রোপনের সময়, লাগানো গাছের পরিচর্যা যেমন- সার, পানি প্রয়োগ ও সংরক্ষণ সম্পের্কে সুষ্ঠু ধারণা থাকলে সফলভাবে ফসল প্রাপ্তি সহজতর হবে। লক্ষণীয় যে অধিক পরিমাণে পানি দেওয়ার জন্য টবের অধিকাংশ গাছ আশানুরূপভাবে বাড়ে না, তাই শুধুমাত্র পাতা কিছুটা নরম হয়ে বা নুয়ে পড়লে পানি দেওয়া ভাল। তাতে শিকড় লম্বা ও শক্ত হয়। উদ্ধিদ মূলের অগ্রভাগের সাহায্যে পানিতে মিশ্রিত খাদ্য সূ² কণা হিসেবে গ্রহণ করে তাই সরবরাহকৃত সার যতটা সম্ভব তরল আকারে প্রয়োগ করলে অল্প পরিমাণ সারের অধিক ফলন পাওয়া যায়। এ জন্য, বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি সারের অপ্রচলিত ব্যবহার বিধি নিচে উল্লেখ করা হলো, যা পারিবারিক বাগান বা টবে লাগানো শাকসবজি, ফুল ও ক্ষেত্র বিশেষ ফল গাছের চারার জন্যও প্রযোজ্য।
গোবর: প্রতি কেজি কাঁচা গোবর তিন লিটার পানিতে মিশিয়ে চার পাঁচ দিন ছায়াযুক্ত স্থানে পচিয়ে প্রতি কেজি পচানো সার দশ লিটার পানিতে মিশিয়ে সেচের পানি হিসেবে গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করতে হবে।
গো-চনা: এক লিটার গো-মূত্র কুড়ি লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় সেচের পানি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। গোশালার ড্রেনের শেষ প্রান্তে একটি পাত্র রেখে খামারীগণ সহজেই গো-চনা সংগ্রহ করতে পারেন।
সেচের পানির সঙ্গে রাসায়নিক সার: এক ভাগ ইউরিয়া, এক ভাগ ট্রিপল সুপার ফসফেট ও এক ভাগ মিউরেট অব পটাশ একত্রে মিশিয়ে মিশ্রিত সারের ষাট গ্রাম পঁাঁচ লিটার পানিতে গুলিয়ে প্রতি চারা গাছের গোড়ায় একশত মিলিমিটার পানি প্রয়োগ করতে হবে।
স্প্রে হিসেবে রাসায়নিক সার: একভাগ ইউরিয়া, একভাগ মিউরেট অব পটাশ একত্রে মিশিয়ে, কুড়ি লিটা পানিতে গুলিয়ে যেকোন চারা গাছের পাতায় ছিটিয়ে পুরো পাতাটি ভিজিয়ে দিতে হবে। আজকাল বাসা বাড়িতে ব্যবহারের জন্য ছোট আকারের স্প্রেয়ার পাওয়া যায় বা বিভিন্ন কীটনাশকের খালি কন্টেইনার ও সংযুক্ত স্প্রেয়ার ব্যবহার করা যায়।
সাবানের ফেনাঃ কাপড় কাচা বা গায়ে মাখার পর সাবানের ব্যবহৃত ফেনা সংগ্রহ করে তিন ভাগ পানির সাথে মিশিয়ে সবজি ও ফুল গাছের পাতায় স্প্রে করলে পাতা সহেজ ও বিস্তৃত হয়, পটাশের অভাব দূর হয়, গাছের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, ক্ষুদে লাল মাকড়সা এবং মিলবাগ জাতীয় পোকাও দমন হয়।
(তথ্য সূত্র : কৃষি উন্নয়ন প্রদর্শিকা : জনশিক্ষা অধিদপ্তর, ১৯৭২, পৃষ্ঠা : ৬৩) সারাদেশের গ্রাম এলাকায় দুই কোটি বাড়ির পারিবারিক বাগানে, ঢাকা শহরের বার লক্ষ বাড়িসহ অন্যান্য সব শহর এলাকার চল্লিশ লক্ষ বাড়ির টবে বা ছাদে লাগানো বাগানে বর্ণিত পদ্ধতিতে তরল সার প্রয়োগের মাধ্যমে শাকসবজি, ফুল ও ফলের ফলন বৃদ্ধির সাথে সাথে বায়ু শোধনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণমুক্ত ও নির্মল হবে।
আরও পড়ুন এবং জানুন Please click here
লেখক : মোঃ ওসমান গনি, প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান (অন ফার্ম ), গবেষণা বিভাগ, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টটিউিট, বাংলাদেশ